আশ শেফা মধুঘর

মৌমাছি ও মধুর প্রাচীনত্বের অনুসন্ধান

মধু ও মৌমাছির প্রাচীনত্বের অনুসন্ধানঃ

আদিম মানুষের উদ্ভবের প্রায় ৫ কোটি ৭ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে মৌমাছির আবির্ভাব। প্রাচীন সংস্কৃতির যেসব পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনও টিকে আছে তাতে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মধু অনুসন্ধানে আদিম মানুষ যে খুবই তৎপর ছিলো তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এ ধরনের সবচেয়ে প্রাচীনতম নিদর্শন হচ্ছে ‘কিউভাস দে লা আরায়া’ তে পাওয়া লাল রঙে আঁকা মধু সংগ্রহকারীদের একটি প্রস্তরচিত্র।

কিউভাস দে লা আরায়া'
কিউভাস দে লা আরায়ায় প্রাপ্ত গুহাচিত্রঃ ম্যান অফ বাইকার্প
‘কিউভাস দে লা আরায়া’ (ইংরেজিতে আরাআ গুহা বা স্পাইডার গুহা নামে পরিচিত) হলো বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পূর্ব স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া রাজ্যের এসকালোনা নদীর উপত্যকায় স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক এর দ্বারা আবিষ্কৃত প্রস্তর শিল্পযুগের প্রাগৈতিহাসিক লোকেদের ব্যবহার্য ৮০০০ বছরের পুরনো একটি গুহা, যেটি ধনুক এবং তীর দিয়ে ছাগল শিকারের আঁকা চিত্র এবং জন্য এবং একটি মানুষের মধু সংগ্রহের চিত্রিত দৃশ্যের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। গুহা টি আইবেরিয়ান ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকার ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট রক আর্টে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গুহাটিতে অঙ্কিত মধু সংগ্রহের চিত্রিত দৃশ্যটির নাম দেয়া হয়েছে “ম্যান অফ বাইকার্প”।
এই বিখ্যাত মধু সংগ্রহের চিত্রকর্মটি এপিপালেওলিথিক বলে মনে করা হয় এবং এটি প্রায় ৮০০০ বছরের পুরানো বলে অনুমান করা হয়।

ছবিটিতে দেখা যায় একজন লোক সম্ভবত হোগলা ঘাসে পাকানো লম্বা দড়ি বেয়ে পাহাড়ের খাড়া ঢালের একটি প্রাকৃতিক কোটর বরাবর উঠে গেছে। লোকটি কোটর থেকে মধু কোষ বের করে তা নিচে নামিয়ে অানার জন্য হাতে ধরা থলে বা ঝুড়িতে রাখতে ব্যাস্ত। বিক্ষুব্ধ কিছু মৌমাছি অনাহুত এই আগন্তুকের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর সেই মৌমাছিগুলোকে অাঁকা হয়েছে লোকটার আকৃতি অনুপাতে বেশ বড় করে।

অন্যান্য কীটপতঙ্গ আর প্রানীর তুলনায় মৌমাছি প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের কাছে অসাধারণ মর্যাদা পেয়েছে। বহু পৌরানিক কাহিনী, উপকথা, গল্প, কুসংস্কার ও রুপকথার জন্ম দিয়েছে মৌমাছি। আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরে আনত মাথা ও সল্পোত্থিত ডানা যুক্ত ডানাযুক্ত মৌমাছি ছিলো দক্ষিণ মিশরের প্রতীক।

ফলকটি ফারাও 'খায়েফ রে' (চতুর্থ রাজবংশ) এর রাজপ্রাসাদের একটি স্থাপত্যখন্ডে পাওয়া
প্রাচীন মিশরীয় ফারাও ‘খায়েফ রে’ (চতুর্থ রাজবংশ) এর রাজপ্রাসাদের একটি স্থাপত্যখন্ড।

এ ছবিতে ফারাওয়ের উপাধি উৎকীর্ণ একটি মিশরীয় ক্ষোদিত ফলকে হায়ারোগ্লিফিক্সে মৌমাছি অঙ্কিত লিখাটি বাংলা অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায় “উত্তর ও দক্ষিন মিশরের রাজা”। ফলকটি ফারাও ‘খায়েফ রে’ (চতুর্থ রাজবংশ) এর রাজপ্রাসাদের একটি স্থাপত্যখন্ডে পাওয়া গিয়েছিল।

ফারাও এর প্রতি নিজেদের আনুগত্য দেখাতে প্রতীক হিসেবে মিশরীয়রা বিভিন্ন সরকারী নথিতে মৌমাছির একটি ছবি আঁকতো। অন্ধকারের দেবতা অমঙ্গলের দেবতা “হু হু” জনগনের যে অনিষ্ট ঘটায় তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে মৌমাছিকে তারা মনে করতো তাদের বিশ্বস্ত সহায়। তাছাড়া মৌমাছি ছিলো তাদের কাছে নিঃস্বার্থতা ও নির্ভরতার প্রতীক, বিপদ ও মৃত্যুকে উপেক্ষা করার শক্তি। তাকে তারা দেখতো পবিত্রতার আদর্শ ও শৃঙ্খলা রক্ষক হিসেবে।

প্রাচীন মিশরীয়রা যাযাবর ধরনের মৌমাছি পালনে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছিলো। দক্ষিন মিশর থেকে পোড়া মাটির পাত্র দিয়ে তৈরী, সহজে বহনযোগ্য পাত্রে মৌচাক ঢুকিয়ে একপাশে মৌমাছি ঢোকার পথওয়ালা কঞ্চিবোনা মাটিলেপা উপরে নুড়িপাথর দিয়ে মুখবন্ধ করা বিশেষ ধরনের মৌচাক নৌকায় করে নীলনদের উজান বেয়ে মিশরের উত্তরাঞ্চলে মৌমাছি নিয়ে যেতো। পরে আবার তারা মৌমাছিদের ফিরিয়ে নিয়ে আসতো সাথে থাকতো প্রচুর মধুর ফসল।

প্রাচীন মিশরীয় “ইবারস প্যাপিরাস” খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ বছর পূর্বে তৈরি এপিথেরাপির প্রথম গাইড যাতে দেখা যায়য় মধু, মোম এবং প্রপোলিস কীভাবে বিভিন্ন ওষুধ এবং প্রসাধনী তৈরি করতে পারে। প্রাচীন গ্রিসে, সৈনিকদের শক্তি ও সাহস যোগাতে তাদের প্রতিদিনের ডায়েটের অংশ হিসাবে মধু খাওয়ার প্রয়োজন ছিল এবং ক্রীড়াবিদরা একইভাবে এটি স্বাস্থ্য পরিপূরকের প্রাথমিক রূপ হিসাবে ব্যবহার করকেন। হিপোক্রেটিস, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৩-৩৫২ বছর বেঁচে ছিলেন লিভার, পেটের অসুস্থতা, আলসার এবং ক্ষত নিরাময়ে মধু ব্যবহার করেছিলেন। তিনি লিখেছেন “মধু জ্বরকে দমন করে, ক্ষত, কারবুনসেল এবং আলসারকে শুদ্ধ করে এবং নিরাময় করে।” গ্রীকরাও মোম এবং মধু থেকে চিকিৎসা মলম তৈরি এবং মিশরীয়দের মতো প্রসাধনী প্রয়োগ ও ব্যবহার উভয়ই করতে জানত।

অনুমান করা হয় এসব বিষয়ের কারনেই দক্ষিন মিশরের ফারাও এর প্রতীক হিসেবে মৌমাছি নির্ধারন করা হয়েছিল।

চতুর্থ শতাব্দী পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলিতে ভারতবর্ষের ঔষধি ব্যবস্থায় আয়ুর্বেদে মধু, মোম এবং প্রোপোলিসের চিকিৎসার উল্লেখ রয়েছে। চীনা ঔষধি বইগুলিতে প্রমাণ রয়েছে যে মধু ও মৌমাছি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রোগ এবং অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। মেসোপটেমিয়ান সংস্কৃতির মাটির ট্যাবলেট খোদিত গ্রন্থগুলিতে দেখা যায় যে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ বছর ধরে মধু ঔষধি হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
খ্রীষ্টপুর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষে ও তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে মেসোপটেমিয়া রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। প্রাচীন লিপিকারদের রচনা থেকে দেখা যায় ব্যাবিলন সাম্রাজ্যে বিপুলভাবে মৌমাছি পালন করা হতো। খ্রীষ্টের জন্মের প্রথম সহস্রাব্দে আসিরিয়া মধু ও জলপাইয়ের দেশ বলে পরিচিত ছিলো। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে প্রথম সারগন এর শাসনকালে এবং তার মৃত্যুর পর মৃতের শরীরে মোমের প্রলেপ মাখানো হতো, এবং তা ডুবিয়ে রাখা হতো মধুতে।

মৌমাছি পালনে অসীরিয়দের ছিলো অসাধারণ দক্ষতা। মৌমাছির ঝাককে বশে আনার জন্য এমন গোপন ধ্বনি তাদের জানা ছিলো যা দিয়ে তারা ইচ্ছেমতো মৌমাছির ঝাককে মৌচাক থেকে বের করতে কিংবা ফের তাতে ফিরিয়ে নিতে পারতো। (রোমক কবি ভার্জিল নিজেও ছিলেন মৌমাছি পালক। তিনি লিখেছেন ঝাঝ করতাল বাজিয়ে মৌমাছির ঝাঁককে মৌচাকে ফিরিয়ে আনা যায়। এটা যে সত্য তা প্রমানিত হয়েছে ইদানিংকালের গবেষনায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে মৌচাক থেকে ৬০ থেকে ১২০ সেমি দূরে অবস্থবত কোনো কম্পনযন্ত্র থাকলে কিংবা কোনো লাউডস্পিকার থেকে ৬০০ হার্জ কম্পাংকের শব্দ হলে মৌমাঝিরা মৌচাকের উপর অনড় হয়ে থাকে। তবে মৌমাছি পালকের পক্ষে এ ধ্বনি সহ্য করা খুবই কঠিন।)

প্রাচীন ভারতে মৌমাছিকে দেবতাদের পবিত্র সহচর হিসেবে গন্য করা হতো বলে পুরানে মৌমাছির মর্যাদার অাসন রয়েছে। সূর্যের অবতার এবং জগতের স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত বিষ্ণুকে কখনও কখনও পদ্মফুলের পেয়ালার উপর বসা ছোট্ট মৌমাছি হিসেবে, কখনও বা তাকে মাথার উপর একটি নীল মৌমাছি সমেৎ চিত্রিত করা হয়েছে। প্রেমের দেবতা কামদেবের প্রতিকৃতি আকঁতে গিয়ে তাকে ধনুক হাতে এবং মৌমাছির মালা দিয়ে তৈরি জ্যা সমেৎ দেখানো হয়। এর প্রতিকী অর্থ হলো, তার তীর একাধারে ভোগান্তি এবং ভালোবাসা দুইই বয়ে অানে।

প্রাচীন গ্রীকরা যাযাবর রীতিতে মৌমাছি পালনে অর্জন করেছিলো চরম সাফল্য। যেখানে গাছপালা ফুলেফুলে ভরে উঠতো, সেখানেই তারা নৌকায় করে মৌচাক নিয়ে যেতো। এফেসাসে অর্তেমিস এর বিখ্যাত দেব গৃহের মধ্যে তার যে শীলামুর্তি ছিলো তা অলংকৃত করা হয়েছিলো ফলবান তরুশাখা দিয়ে। যেগুলোর উপর উপবিষ্ট ছিলো মৌমাছি। ঐ মন্দিরের ধর্ম যাজিকাদের বলা হতো ‘মেলিসসি’ অর্থ্যাৎ মৌমাছি। আর এই সমৃদ্ধ নগরীটির পরিচয় প্রতীকেও অঙ্কিত ছিলো মৌমাছির ছবি।

প্রত্নতাত্তিক খনন, রূপকথা আর শতশত বছরের দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে জানা যায় ইউরোপে বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভুখন্ডে বসবাসকারী জনগনের মধ্যে মৌমাছি পালন ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছিলো। ইতিহাস রচনার জনক হেরোদোতাস ( খ্রি.পু: ৫ম শতক) উল্লেখ করেছেন যে সিথীওরা ( Seythians) মধু ও মোমের বানিজ্য করতো ব্যপকভাবে।

আজ থেকে ২ হাজার বছরেরও আগে ওরারতুর জনগন ( বর্তমান অারমেনিয়নদের পুর্বপুরুষ) পলেস্তারা লাগানো টুকরির মৌচাকে মৌমাছি পালতো।

খ্রিষ্টত্তোর দশ শতকের বিখ্যাত আরব লেখক ও পর্যটক আবু আলী আহমেদ বিন ওমন ইবন দস্ত’ তার খাজার বুরিয়াত, বুলগার, ম্যাগিয়ার, স্লাভ ও রুশাখ সম্পর্কে তথ্য নামক পান্ডুলিপিতে লেখেনঃ স্লাভদের জনপদ বৃক্ষাচ্ছাদিত সমতলভূমি এবং তারা বনাঞ্চলে বসবাস করে। কাঠ দিয়ে তারা একরকমের কলস বানায় যার মধ্যে মৌমাছিরা থাকে এবং নিজেদের মধু মজুত রাখে।

১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত রুশ আইনে দেখা যায় মৌমাছি পালক ও বনমধু সংগ্রহকারীদের অধিকার রক্ষামুলক কিছু আইন। যাতে দেখা যায়, বনমৌমাছি বাসা বেঁধেছে এমন গাছ কেউ নষ্ট করলে কিংবা মধু আহরনের জন্য সেগুলো কেউ ধ্বংস করে দিলে তার বিরুদ্ধে মোটা জরিমানা অারোপের ব্যাবস্থা ছিলো। কিছু কিছু অঞ্চলে এর শাস্তি ছিলো মৃত্যুদন্ড। সেকালে মধু ছিলো অসাধারন গুরুত্বপূর্ণ পথ্য। তা সুদে ধার দেওয়া চলতো। মধু ধারের কাজকর্মকে বলা হতো মধুর সুদি কারবার। রুটি অার মধু ছিলো টাকার বিকল্প।

প্রাচীনকাল থেকেই মধু নানান কাজে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে। হাজারও ঔষধি গুণাবলী সম্মিলিত এ পন্যটি সময়ের সাথে দিন দিন ভেজালে পরিনত হলেও ‘আশ শেফা’ কেবল আপনাদের কথা ভেবেই খাঁটি মধুর পসরা সাজিয়েছে। আমাদের পন্য একবার ব্যাবহার করলেই বুঝতে পারবেন বাকি সকল পন্যের সাথে আমাদের পন্যের বিশেষ পার্থক্য। বিশ্বাসে মিলে মুক্তি, তর্কে বহুদুর।
আপনাদের সার্বিক সন্তুষ্টিই আমাদের কাম্য।
ধন্যবাদ।

আরোও পোস্ট দেখুনঃ
১. মধু ও শারীরিক সুস্থতা > টপিক:শারীরিক সুস্থতায় মধু গুণাগুণঃ
২. মধু ও স্বাস্থ্য > টপিক:সাধারন জ্বর, ঠান্ডা, কাশি প্রতিরোধে মধুর ঔষধি গুণাঃ
৩. মধু ও রুপচর্চা > টপিক:রুপচর্চায় মধুর ব্যবহারঃ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Call Now Button