আশ শেফা মধুঘর

টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগীদের মধু খাওয়া কতটুকু নিরাপদ?

honey & diabetics

 

যদিও বহু শতাব্দী ধরেই পৃথিবীতে সাধারণ খাদ্য ও ঔষধি খাদ্য হিসেবে মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে বটে তবে ডায়াবেটিস ( টাইপ ২ ) রোগীদের বেলায় মধু খাওয়া কতখানি নিরাপদ এ বিষয়ে মৃদু বিতর্ক থাকার কারনে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীরা মধু খেতে পারবেন কি পারবেন না এর উত্তরটা একেবারে সরল করে দেয়া কঠিন। কেননা..

টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ওপর মধুর প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফলাফল নিজেই দ্বিধাবিভক্ত।

কিছু গবেষণায় দেখা যায় মধু সাধারণ চিনির তুলনায় দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়ায়। সেই সাথে ইনসুলিন ক্ষরণের মাত্রাও বাড়ায়। ফলে দ্রুত সেই গ্লুকোজ আবার কমেও যায়। সেই সাথে ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা বাড়াতেও মধুর উপকারিতা আছে।

আবার ৩২ জন টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায় ২ টেবিল চামচ মধু ও ১ কাপ বা ১২৫ গ্রাম সাদা ভাত খাবার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধির হার প্রায় সমান।

তবে দীর্ঘস্থায়ী গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে মধুর খুব বেশি উপকারিতা নেই। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ গবেষণায় দেখা যায় ২ মাস মধু ব্যবহারের পর রক্তের HbA1c (এক প্রকার হিমোগ্লোবিনের ফর্ম যেটি শরীরের গ্লুকোজ ইউনিটগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে গঠিত হয়) এর পরিমাণ বেড়ে যায়।

আর কোন টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ইচ্ছেমাফিক মধু সেবন করা মানে নিজের জন্য বড় ধরনের রিস্ক নেয়া। কেননা ডায়বেটিস রোগীর জন্য বেশীরভাগ খাদ্যই ইচ্ছেমাফিক খাওয়া যায় না। আর যেহেতু এক টেবিল চামচ মধুতে থাকে প্রায় ১৭ গ্রাম শর্করা, যার খাদ্যমান প্রায় ৬৪ কিলোক্যালোরি, যেখানে এক টেবিল চামচ বা ১২ গ্রাম চিনির খাদ্যমান ৪৯ কিলোক্যালোরি, সেক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মধু তো কোনো মিষ্টিদ্রব্যের ক্ষতির মতোই ক্ষতিকর হওয়ার কথা।

তবে মিষ্টিকারক ছাড়াও মধুর অন্য অনেক ওষুধি গুণ আছে। মধুর গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন রকম এন্টি অক্সিডেন্ট। আমাদের দেহে বিপাক ক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন জারক যৌগ বা ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হয়, যেগুলো দেহকোষের বিভিন্ন উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে কোষের ধ্বংস ত্বরান্বিত করে। বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ও প্রদাহের পেছনে এসব যৌগের ভূমিকা আছে। দেহকোষের অনিয়ন্ত্রিত ধ্বংস বা বৃদ্ধি ও কিছু ক্যান্সার সৃষ্টিতেও এসব যৌগ অনেকাংশেই দায়ী। এন্টি অক্সিডেন্ট এসব ক্ষতিকর যৌগের সাথে যুক্ত হয়ে এগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ফলে দেহ এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। আর এসব এন্টি অক্সিডেন্টের একটা ভালো উৎস হলো প্রাকৃতিক খাঁটি মধু। এতে বিভিন্ন জৈব এসিড ও ফেনলের মতো প্রয়োজনীয় এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে। এছাড়া গবেষণায় দেখা যায়, মধু রক্তে থাকা বিভিন্ন এন্টি অক্সিডেন্টের কার্যকারিতাও অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে মধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মধুর এসব ওষুধি গুণের কথা বিবেচনা করলে মধু অবশ্যই স্বাস্থ্যের জন্যে ভালো। বিশেষ করে চিনি, সিরাপ বা অন্যান্য কৃত্রিম মিষ্টিদ্রব্যের তুলনায় মন্দ নয় মোটেই।

সুতরাং বলা যায়, এসব বিবেচনায় টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীরা মধু একেবারেই খেতে পারবেন না, তা নয়। তবে তা খেতে হবে বুঝেশুনে।

মধু সকলের পক্ষে ঠিক নয়, যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে আনা দরকার। তবে যদি কারো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে, নিয়মিত ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করেন তাহলে সামান্য পরিমাণ মধু প্রতিদিন খাওয়াই যায়, তবে সেটি হতে পারে এক দু টেবিল চামচ পরিমাণ। আর সেক্ষত্রে অবশ্যই অন্যান্য চিনি বা মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য বাদ দিতে হবে। ব্যাক্তিগত চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের নিত্যদিনের রুটিনের সাথে মিল রেখে সেটি ব্যালান্স করা উচিৎ।

অর্থাৎ কথা হলো যতটুকু মধু খাওয়া পড়বে তার সমতুল্য পরিমাণ শর্করা জাতীয় খাদ্য ওই বেলা কম খেতে হবে। আর একসাথে বেশি পরিমাণ মধু কোনোভাবেই খাওয়া উচিত হবে না। এক চামচ মধু খাওয়ার জন্য প্রায় দেড় কাপ ভাত, ছোট একটি রুটি খাওয়া বাদ দিতে হবে। কেউ যদি এরূপ হিসাব মেনে নিয়ে মধু খেতে পারে তবে তার জন্য খুব ক্ষতিকর হবে না, এবং এটাই সবচাইতে নিরাপদ।

আর এমনটা করা যদি কোন টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তবে তার জন্য মধু বর্জন করাই ভালো।

সবচেয়ে ভালো হয়, বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে নিলে, কেননা তিনিই রোগের অবস্থা বুঝে সর্বোত্তম পরামর্শ দিতে পারবেন। এই হলো মোদ্দা কথা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Call Now Button