আশ শেফা মধুঘর

খাঁটি মধু কিভাবে চিনবেন?

খাটি মধু কিভাবে চিনবেন
খাটি মধু চেনার উপায়ঃ

খাঁটি মধু কিভাবে চিনবেন?

“ভাইয়া / আপু আপনার মধু খাঁটি তো? খাঁটি মধু চেনার উপায় কি? কিভাবে বুঝবো আপনাদের মধু খাঁটি?’’- এ জাতীয় প্রশ্ন আমাদের অনেকেই করে থাকেন। যেহেতু আজকাল চারিদিকে শুধু ভেজাল পন্যের সমারোহ সুতরাং, এমন প্রশ্ন মনে আসাটাই স্বাভাবিক।
প্রথমে আমি আমার দীর্ঘ বিশ বৎসরের মধুর ব্যবসার অভিজ্ঞতার আলোকে কিভাবে খাাঁটি মধু শনাক্ত করি, সেটাই আপনাদের একটু বলি:

মধু যে ফুলেরই হোক, বা যে অঞ্চলেরই হোক, যে কোন খাঁটি মধুরই নিজস্ব কিছু সাধারন বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন:
১. মধুর উপরের স্তরে হালকা ফেনা বা বুদবুদ হওয়া। মধু নাড়াচাড়া করলে বা পাত্র ঝাঁকি খেলে এটা বেশী হয়।
২. মধুতে গ্যাস হওয়া। এই প্রকৃয়াটি অবশ্য খুব ধীরে হয়, মধুর পাত্র দীর্ঘদিন বন্ধ রাখলে এটা বোঝা যায়।
৩. মধুর ওপরে গাদ জমা। এই প্রকৃয়াটিও খুব ধীর, মধুর পাত্রে দীর্ঘদিন নাড়াচাড়া না করলে এটা দেখা যায়। এই গাদ হলো আসলে মধুতে মিশে থাকা ফুলের পরাগ বা নেকটার, যা আলাদাভাবে ভেসে ওঠে।
৪. তলানীতে চিনির মত পদার্থ জমা (যা মুলত সুক্রোজ ও গ্লুকোজ)।
৫. মধু পাতলাও হতে পারে, যেমন বরই ফুল ও সুন্দরবনের মধুতে ময়েশ্চারের পরিমাণ বেশি থাকে এজন্য পাতলা হয় এবং প্রচুর গ্যাস হয়।
এগুলো দেখে আমি খাঁটি মধু চিনি।  তবে এসবই সময়স্বাপেক্ষ, এজন্য হাতে প্রচুর সময় থাকতে হয়।

কিন্তু যখন হাতে সময় কম থাকে, তখন কিভাবে শনাক্ত করি?

শুধু মাত্র দুটা যন্ত্র তখন আমাকে খাঁটি মধু চিনতে সাহায্য করে, সেটা হলো নাক ও জিহ্বা।

ভালো মধু চেনার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো আগে খারাপ মধু চেনা। যিনি যতো বেশী ভেজাল মধু দেখেছেন/ চিনেছেন/ খেয়েছেন তিনি তত বেশী ভালো ও খাঁটি মধু শনাক্ত করার যোগ্যতা রাখেন।

জীবনে এতো ভ্যারাইটিজ ধরনের মধু খেয়েছি যে একটু খানি মধু হাতের তালুতে নিয়ে প্রথমে শুঁকে  তারপর মুখে দিলেই বলে দিতে পারি কোনটা খাঁটি মধু কোনটা নয়।
যারা মধু চেনেন না, তারা সবচেয়ে সহজে যেটা করতে যান তা হলো ইউটিউব দেখে মধু পরীক্ষার চেষ্টা করা।ইউটিউবে আসল মধু চেনা বা পরীক্ষা করার হাজার রকম উপায়ের বিভিন্ন ভিডিও দেখে দেখে মধু পরীক্ষা করার চেস্টা করেন অনেকেই। এসব পরীক্ষার কিছু আংশিক সঠিক হলেও বেশীরভাগই ভ্রান্ত। তাই এদের পাল্লায় পড়ে অনেক সময় খাঁটি মানের মধুকেও ভেজাল মনে করে ভুল করেন অনেক নবীন ক্রেতা। বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, আমি যেগুলো বললাম সেগুলো ছাড়া খাঁটি মধু চেনার আর কোনো সঠিক ও কার্যকরী কোন উপায় আমি আজও খুঁজে পাইনি। জীবনে বহু দেখেছি যে মধু সম্পর্কে নানান সামাজিক অজ্ঞতা, প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা কুসংস্কার, এবং প্রচলিত অবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে মানসম্মত মধুর ব্যাপারেও অনেককে সন্দেহ পোষণ করতে।

আসুন দেখে নেই আমাদের সমাজে প্রচলিত  কি কি ধরনের মধু পরীক্ষার প্রচলন ও ভুল ধারনা আছে:

১. “মধু কখনই জমে না, যদি জমে তাহলে তা ভেজাল”
২. “মধুতে পিপড়া লাগেনা, লাগলে তা ভেজাল”
৩. “মধুতে লাল পিপড়া লাগেনা, শুধু কালো পিপড়া লাগে, লাল পিপড়া লাগলে তা ভেজাল”
৪. “মধুতে কুকুর মুখ দেয় না, কারন মধু একটা গরম খাবার”
৩. “খাটি মধু খেলে সাথে সাথেই শরীর গরম হয়ে যায়, ভেজাল মধুতে কিছুই হয় না”
৪. “মধুর ফোঁটা হাতের বৃদ্ধাংগুলির নখের উপর রেখে সেটা পড়ে গেলে তা খাঁটি নয়”
৫. “মধু খাঁটি হলে পানিতে মেশালে গলে যাবে না বা পানির সাথে কোনোভাবেই মিশবে না” 
৬. চুন পরীক্ষা   
৭. হাতে ঘসে দেখার  পরীক্ষা      
ইত্যাদি নানা ধরণের মধুর পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা অনেকেই শুনে বা বলে থাকেন, যা আসলে মধুর ধরণভেদে ভিন্ন-ভিন্ন ফলাফল প্রদান করে থাকে। এক্ষেত্রে জেনে রাখা উচিৎ- এসব প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি না সঠিক, আর না বিজ্ঞানসম্মত।
খাঁটি মধু কখনো জমাট বাধে না- কথাটি মোটেই সঠিক নয়।
মধুর প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে আছে সুক্রোজ এবং গ্লুকোজ। গ্লুকোজ সুযোগ পেলে জমাট বাধবেই। একে বলে ক্রিসটালাইজেশন। বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ফুলের মধু জমাট বাধতে দেরী হতে পারে। যেমন – আসল সুন্দরবনের মধুতে পানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় এটা জমাট বাধে না। কিন্তু যে মধুতে পানির পরিমান কম থাকে, তা সময়ের সাথে সাথে ক্রিস্টালাইজড হতে শুরু করে, যেমন শতিকালীন সরিষা ফুলের নতুন মধু। বিভিন্ন ফুলের মধুর গ্রেড কম বেশির কারণে বা ময়েশ্চারের কম বেশির কারণে জমাট বাধতে সময় নেয়।
মধুতে থাকে গ্লুকোজ, সুক্রোজ, ফ্রুকটোজ, ও মন্টোজ যা পিঁপড়ের জন্য অতীব লোভনীয়, পিঁপড়ে, মাছি ইত্যাদি আসবেই।
কুকুরদের মিস্টি জাতীয় জিনিস না খাওয়ার কোন কারন নেই, এরা কেক বিস্কিট জাতীয় খাবার অহরহই খায়। যারা গ্রামের দিকে থাকেন এবং যারা আখ মাড়াই করে গুড় বানাতে দেখেছেন, তারা জানেন গুড় বানাতে আখের রস জ্বাল করার সময়ে এর উপরিভাগ থেকে ফেলে দেয়া ফেনা বা চিটাগুড় শেয়াল ও কুকুরের প্রিয় খাদ্য। তবে মধুর বেলায় আমি বলব যে আমি নিজে কোনদিন কোন কুকুরকে মধু খাইয়ে পরীক্ষা করি নাই, সে অভিরুচিও আমার হয় নাই, শুধু তাই নয়, কেউ কুকুরকে খাটি মধু দিয়ে পরিক্ষা করে দেখেছে সে খায় কি খায় না কিংবা কেউ কুকুরকে খাঁটি মধু খাওয়াতে পেরেছে বা পারে নাই- এমন কোন কিছু আমি আমার ৩০ বছরের মধুর ব্যবসার জীবনে কখনো দেখিও নাই, শুনিও নাই।
মধুর ঘনত্ব-ভিত্তিক টেস্টের বিষয়টিও ভিত্তিহীন। কারণ, মধু পাতলাও হতে পারে। যেমন – বরই ফুলের মধুতে ময়েশ্চারের পরিমাণ বেশি থাকে, এজন্য তা পাতলা হয় এবং প্রচুর গ্যাস হয়। সিজনাল কারণে ময়েসচারের তারতম্য থাকলে মধুর ঘনত্ব পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক। একারণে পানিতে ঢেলে পরীক্ষা, আঙ্গুলের নখে নিয়ে পরীক্ষা, টিস্যু বা নিউজপ্রিন্ট কাগজে নিয়ে পরীক্ষা করার ফলাফল মোটেও সঠিক ফলাফল দিতে সক্ষম নয়।
খাটি মধু খেলে সাথে সাথেই সতেজ অনুভুতি হয়, আবসাদ ভাব থাকলে তা কেটে যায়, শরীর মন চাঙ্গা হয়ে ওঠে, তাই হয়তো এই বিষয়টিকেই অনেকে “শরীর গরম হয়ে যাওয়া” বলে ব্যক্ষ্যা করে থাকেন। তাছাড়া খাঁটি মধুতে জ্বরের মতো শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি কখনোই হয় না, বরং শরীরের অধিক তাপমাত্রায় অর্থাৎ জ্বরে মধু বেশ উপকারী।
মধুতে আগুন ধরলে আসল মধু, ধারণাটিও সম্পূর্ণ অমূলক। মধুর সাথে মোম মিশিয়ে যদি তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় তবে মধুতে খুব সহজেই আগুন জ্বলবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই মোমটা যদি মধুতে না মিশিয়ে চিনির শিরাতে মেশালেও একই ফলাফল আসবে।
পরিশেষে, এটাই বলতে হয় যে: দির্ঘদিন যাবৎ খাঁটি মধু ব্যাবহার এবং পান করার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, শুধুমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব অভিজ্ঞতার দ্বারা চোখের দেখা, নাকের শোঁকা আর জিহ্বার সাহায্য খাঁটি মধু শনাক্ত করা, এছাড়া এমনিতে কোন উপায় নেই। শুধু  মাত্র ল্যাব টেস্ট ছাড়া। খাঁটি মধু বা ভেজাল মধু চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে ল্যাব টেস্ট।
এর বাইরে আরেকটি উপায় অনুসরণ করা যেতে পারে। তাহলোঃ মধু নিয়ে গবেষণা করেন এবং মধু বিষয়ে সঠিক জ্ঞান রাখেন ও সত্য কথা বলেন এমন কোনো ব্যক্তি যদি বলেন মধু খাঁটি বা ভেজাল, তাহলে তার কথায় আস্থা রাখা যায়। এর বাইরে সাধারণ মধু ক্রেতাদের আর কোনো উপায় নাই খাঁটি বা ভেজাল মধু চেনার।
তবে প্রশ্ন যদি হয় খাঁটি মধু পাবেন কীভাবে তার উত্তর এতটুকু বলতে পারিঃ

 

১। আপনি গ্রামের দিকে থাকলে বা গ্রামের সাথে ভালো যোগাযোগ থাকলে, নিজের মধু নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে সংগ্রহ করুন।
২। এটা সম্ভব না হলে, কোনো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। যেমন আমরা।
প্রাচীনকাল থেকেই মধু নানান কাজে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে। হাজারও ঔষধি গুণাবলী সম্মিলিত এ পন্যটি সময়ের সাথে দিন দিন ভেজালে পরিনত হলেও ‘আশ শেফা’ কেবল আপনাদের কথা ভেবেই খাঁটি মধুর পসরা সাজিয়েছে। আমাদের পন্য একবার ব্যাবহার করলেই বুঝতে পারবেন বাকি সকল পন্যের সাথে আমাদের পন্যের বিশেষ পার্থক্য। বিশ্বাসে মিলে মুক্তি, তর্কে বহুদুর।
আপনাদের সার্বিক সন্তুষ্টিই আমাদের কাম্য।
ধন্যবাদ।
আরোও পোস্ট দেখুনঃ
১. মধু ও শারীরিক সুস্থতা > টপিক:শারীরিক সুস্থতায় মধু গুণাগুণঃ
২. মধু ও স্বাস্থ্য > টপিক:সাধারন জ্বর, ঠান্ডা, কাশি প্রতিরোধে মধুর ঔষধি গুণাঃ
৩. মধু ও রুপচর্চা > টপিক:রুপচর্চায় মধুর ব্যবহারঃ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Call Now Button