আশ শেফা মধুঘর

আসুন, মৌমাছির মতো হই

ভুমিকা:

মৌমাছির মতো হওয়ার ধারণাটি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এসেছে।

ইমাম আহমাদ বর্ণিত একটি সুন্দর হাদিসে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেনঃ

“যার হাতে মুহাম্মদের (সা.) আত্মা, একজন মুমিন মৌমাছির মতো, যা নিজেও খাঁটি ও স্বাস্থ্যকর জিনিস খায় এবং যা দেয় তাও খাঁটি এবং স্বাস্থ্যকর। আর যখন এটি কোনও কিছুর উপরে অবতরণ করে তখন তা ভাঙ্গে না বা নষ্ট করে না”

এখন আসুন আমরা মৌমাছির আরোও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য এবং তাদের গুনাবলী বিশ্লেষন করে বোঝার চেস্টা করি তাদের সফলতার মূল রহস্য কি এবং কিভাবে তা আমাদের জীবনে কাজে লাগাতে পারিঃ

 

১. জীবনের উদ্দেশ্য বোঝা:

মৌমাছি তাদের সত্তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারে এবং এটি অর্জনের জন্য তাদের পুরো জীবনযাপন করে। তারা ভালো করেই জানে যে তারা যা সংগ্রহ করছে তা তারা ভোগ করতে পারবে না, তবু তারা তাদের কর্তব্য ও কাজে বিন্দুমাত্র হেলাফেলা করে না।

একজন মুমিনের ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। আমাদের কেবল নিজের সম্পর্কেই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয় এবং আমাদের নিজ নিজ জীবনটাকে আর আমাদের দুনিয়ার ভোগ লালসা চরিতার্থ করার করার পেছনেই যাবতীয় শ্রম ও অর্থ ব্যয় করা উচিত নয়। আমাদের জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যটি দেখতে হবে, বুঝতে হবে এবং সেই অনুসারে কাজ করতে হবে।

ইবনে উমর (রাঃ) বলেন:

“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কাঁধে ধরে বললেন: “তোমরা এই পৃথিবীতে থাকো যেন তুমি অপরিচিত বা ভ্রমণকারী। “

হযরত উমর (রাঃ) আরোও বলতেন:

“যখন সন্ধ্যা হয়, তখন সকাল পর্যন্ত বাঁচার আশা কোরেো না এবং যখন সকাল আসে তখন সন্ধ্যা অবধি বাঁচার আশা কোরো না। সুস্থ থাকতে নিজের অসুস্থতার জন্য প্রস্তুতি নাও, বেঁচে থাকতে নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নাও [বুখারী]”

 

২. খাঁটি উৎস থেকে খাওয়া:

মৌমাছি কেবল এমন ফুল থেকে খায় যা খাঁটি এবং স্বাস্থ্যকর। এটি অন্যান্য পোকামাকড়দের মতো, ময়লা, নষ্ট বা পঁচে যাওয়া জিনিসগুলির প্রতি আকৃষ্ট হয় না। তেমনিভাবে ইমানদারদের কেবল তাইই খাওয়া উচিত যা খাঁটি ও স্বাস্থ্যকর, যা হালাল এবং অবাঞ্ছিত বা হারামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া উচিত নয়। এটি কেবল খাবারের বেলায়ই নয়, আমাদের আচার-আচরণ, কাজে কর্ম, আয় উপার্জন সম্পর্কেও প্রযোজ্য।

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“হে লোকেরা! আল্লাহ নিজে খাঁটি এবং তিনি কেবল যা গ্রহণযোগ্য তা গ্রহণ করেন! আল্লাহ মুমিনদেরকে যা আদেশ করেছেন তা রসূলগণকেও আদেশ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, হে প্রেরিতগণ! খাঁটি খাবার থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর এবং তিনি বলেনঃ হে ইমানদারগণ! আমরা আপনাকে যে শুদ্ধ ও উত্তম খাবার দিয়েছি তা থেকে খাও।”

হজরত আবু সা’দ রা. বলেনঃ

“যে কেউ বৈধ উপার্জনে নিজেকে বজায় রাখে, নবীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকে, জান্নাত তার প্রাপ্য এবং তা তার আবাসস্থল হবে।”

 

৩.নিজেদের মুখ থেকে যা বের হয় তার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা, জিহ্বাকে সংযত রাখাঃ

মৌমাছির মুখ থেকে যা বের হয় তা হল একটি শুদ্ধ তরল, মধু, যা অসুস্থতা থেকে মানবতাকে নিরাময় দেয়। ঠিক তেমনই আমাদের কথাগুলি পরিষ্কার এবং সুন্দর হওয়া উচিত এবং মানবতার উপকারের লক্ষ্যে হওয়া উচিত। মৌমাছির মুখ থেকে মধু তাৎক্ষণিকভাবে বের হয় না বরং এটি প্রক্রিয়াজাত হয় এবং বেরিয়ে আসার আগে পরাগ কে উত্তমরুপে প্রকৃয়াজাত করা হয়। তাই আমরা যা বলতে চাই, বলার আগে তা প্রথমে উত্তমরুপে বিবেচনা করে নেয়া উচিত। কথা বলার ক্ষেত্রে একটি স্বতঃস্ফূর্ত অচিন্তিত প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বরং সুচিন্তিত এবং ন্যায় ও সততার প্রতিফলন তাতে থাকা উচিত।

রাসুল সা. আমাদের কথা বলার গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম আত-তিরমিযী ও ইবনে-মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত একটি প্রামাণ্য কয়েকটি  হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“একজন ব্যক্তি এমন একটি কথা বলল যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সন্তুষ্টি আনয়ন করে এবং সে এ সম্পর্কে সে হয়তো খুব বেশি কিছু ভাবেও না, তবুও আল্লাহ (আঃ) কেয়ামতের দিন এ ব্যাপারে তার ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন এবং একজন ব্যক্তি এমন একটি কথা বলল যা আল্লাহ তাআলার কাছে অপছন্দনীয়, এবং সে এ সম্পর্কে হয়ত বেশি কিছু ভাবেও না, তবুও আল্লাহ তাআলা (এই কথার কারণে) কেয়ামতের দিন তার ক্রোধ ও ক্রোধ তাঁর উপর চাপিয়ে দেবেন ”

“যে ব্যক্তি সঠিক অবস্থানে থেকেও বিতর্ক ছেড়ে দিয়েছে, জান্নাতে তার উচ্চ পদমর্যাদার একটি প্রাসাদ নির্মিত হবে। আর যিনি মিথ্যাবাদী হয়ে বিতর্ক ছেড়ে দিয়েছেন, তার জন্য জান্নাতের কেন্দ্রে একটি প্রাসাদ তৈরি করা হবে। ”

“দয়া করে কথা বলা এবং ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো জান্নাতের গ্যারান্টি।”

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেনঃ

“এবং আপনার গতিতে সংযমী হন এবং আপনার গলার স্বর নিচু করুন; প্রকৃতপক্ষে শব্দের মধ্যে সবচেয়ে শ্রুতিকটু গাধার কণ্ঠস্বর…” ( ৩১: ১৯-২০)

 

৪.পারস্পরিক সম্মান শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা, কৃতজ্ঞ হওয়া এবং সম্পর্কের কথা মনে রাখাঃ

মৌমাছি যে ফুল থেকে পরাগ সংগ্রহ সেগুলি সে নষ্ট করে না, এভাবে ফুলের প্রতি সে সম্মান দেখায়। অনুরূপভাবে মুমিনের উচিত আল্লাহর সৃষ্টির সাথে তার আচরণে বিনয়ী হওয়া, যেন তাদের দ্বারা কোনও উপকার করার সামর্থ্য না হোক, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে, বেআইনীভাবে যেন কারোও ক্ষতি করা না হয়ে যায়।

মৌমাছিরা ফুল থেকে যা নেয় ফুল কে তার বহুগুন ফিরিয়ে দেয়; এটি ফুলের পরাগ একটি ফুল থেকে অন্য ফুলে স্থানান্তর করে ফুলকে পরাগায়িত করে যার ফলস্বরূপ তার ভবিষ্যতের বৃদ্ধি ঘটে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে মৌমাছিদের মতো আমাদেরও অনুরুপ চেষ্টা করা উচিত।

ইসলাম আমাদের ভালবাসা, মনোযোগ, স্নেহ, করুণা এবং সময় দিয়ে উদার হতে বলে। ইসলাম আমাদের বন্ধু, স্বামী, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন এবং শিশুদের স্বাভাবিকের অতিরিক্ত দয়া ও ভালোবাসার পাত্র হিসেবে বিবেচনার বার্তা দেয়।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“ যারা দয়ালু তাদেরকে করুণা করা হবে। পৃথিবীর লোকদের প্রতি দয়া কর এবং আকাশের উপরে একজন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করবেন। যে ব্যক্তি তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখে তবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রাখবেন এবং যে ব্যক্তি তার পরিবার ত্যাগ করবে আল্লাহ তাকে ত্যাগ করবেন। (তিরমিজি)

“তুমি যখন নিজের ভাইয়ের মুখে হাসি ফোটাও, তা সদকা হয়।” (তিরমিজি)

“কেবল দুষ্ট লোকই তাদের (মহিলাদের) সাথে কটু ব্যাবহার করে এবং সম্মানিত ব্যক্তি হ’ল সে, যে তাদের (মহিলাদের) সম্মান করে”

“আল্লাহ সদয় এবং সর্ব বিষয়ে দয়া পছন্দ করেন।” (বুখারী / মুসলিম)

আবু আবদুল্লাহ বিন-হারেস রা. বলেছেন:

“আমি আল্লাহর রাসূলের চেয়ে হাসির অভ্যাসে আর কাউকে দেখিনি।” (তিরমিযী)

 

৫. একটি মৌমাছি অন্য মৌমাছির রিজিকে মুখ দেয় নাঃ

যখন কোন চাকের একটি মৌমাছি কোন ফুলের পাশ দিয়ে যায় তখন এটি গন্ধ নেয় এবং পর্যবেক্ষণ করে দেখে যে ফুলটিতে ইতিমধ্যে অন্য কোন চাকের মৌমাছি এসেছিলো কিনা। যদি এমন কোন প্রমান সে পায় তবে সেই ফুলে সে আর বসে না।

মুমিনদেরও এই গুণটি প্রদর্শন করা উচিত এবং অন্য মুসলমান ভাই কে কোন রিজিক প্রাপ্তি থেকে বন্চিত করার চেষ্টা করা উচিত নয়। আল্লাহর রিযিক বিশাল। সত্যিকারের একজন মুমিন অন্য মুমিন এর রিযিক হস্তগত করে না।

আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে রাসুল সা. বলেছেনঃ

“পবিত্র জীবনের সত্তার শপথ করছি যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের মধ্যে কেউ সত্য বিশ্বাসী হতে পারে না যতক্ষণ না সে তার সহোদর ভাইয়ের জন্য তাই কামনা করে যা সে নিজের জন্য কামনা করে।” (বুখারী)

“একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই, সুতরাং তার উচিত তার উপর অত্যাচার না করা, তাকে ত্যাগ করা বা তুচ্ছ না করা।”

আবূ হুরায়রা (রাঃ) দ্বারা বর্ণিত, নবী সা. বলেছেনঃ

 

“একজন মুসলমানের উপর মুসলমানের পাঁচটি দাবী রয়েছে: সালাম দেওয়ার সময় তার সালামের জবাব দেওয়া; অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখতে যাওয়া; তাঁর জানাজায় অংশ নেয়া; খাবারের জন্য আমন্ত্রণ করলে তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং, যখন তিনি হাঁচি দেন, তখন ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ (আল্লাহর রহমত আপনার উপর রইল ) বলা।”

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেনঃ

 

“একজন লোক নবী করীম সা. কে জিজ্ঞেস করলেনঃ ইসলামের কোন দিকটি সর্বোত্তম? তিনি বললেনঃ লোকেদের খাওয়ানো এবং চেনা অচেনা সকলকে সালাম দেয়া” (বুখারী)

ইবনে আব্বাস (রা।) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

 

“যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে, সে মুমিন নয় ” (আল-হাকিম)।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেনঃ

“মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।” [৪৯:১০]

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন মহিলা একে অপরকে রক্ষাকারী: তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং খারাপ কাজ নিষেধ করে। তারা নিয়মিত নামাজ পড়ে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের সা. আনুগত্য করে। তাদের প্রতি আল্লাহ তাঁর করুণা বর্ষণ করবেন, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [৯:৭১]

৬. কাজে/ কর্তব্য পালনের সময়ে কঠোর পরিশ্রম করা, কষ্ট সহ্য করাঃ

আমরা সবাই “মৌমাছির মতো ব্যাস্ত” উক্তিটি শুনেছি এবং কথাটি সত্যই তাদের জীবনকে প্রতিফলিত করে। মৌমাছিরা সম্মিলিতভাবে ৫৫,০০০ মাইল ভ্রমণ করতে পারে এবং মাত্র এক সের মধু তৈরি করতে পর্যাপ্ত অমৃত সংগ্রহ করতে তাদের ২০ মিলিয়ন ফুল পরিদর্শন করতে হয়!

আসুন, আমরা তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করি এবং আমরা যে কোনও পদক্ষেপই নেই না কেন, সেরা ফলাফল অর্জনের স্বার্থে সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

 

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন যে যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কাজ করে তবে সে তা সুন্দরভাবে পূর্ণ করবে” (আল-বায়হাকী)।

 

আমাদের পরস্পরের সেবা করার ক্ষেত্রে, আমাদের অসাধারণ পরিশ্রম করতে হতে পারে এবং কষ্ট ক্লেশ সহ্য করতে হতে পারে। মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের প্রত্যেকেরই দরকারে কঠোর মানুষিক ও শারিরীক পরিশ্রমের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি থাকা উচিত এবং এ ব্যাপারে সদা দৃড় সংকল্পবদ্ধ থাকা উচিত।

 

৭. যাবতীয় অহংকার বা ইগো ত্যাগ করাঃ

মৌমাছিরা অহংকার বা ইগো থেকে সম্পুর্ন মুক্ত। তাদের প্রত্যেকের প্রাথমিক কর্তব্য হলো কলোনির বা নিজেদের জন্য কোনও হুমকি এলে সাথে সাথে বিনা দ্বিধায় নিজ কর্ত্যব্যে ঝাঁপিয়ে পরা, প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করা।

তেমনই ইমানদারগণ যখন তাদের ধর্মে, তাদের আসল পরিচয়ে আসে তখন তাদের পুর্বের সমস্ত অহমিকা এবং অহংকারকে ত্যাগ করেই আসে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

“আমি কি জান্নাতীদের সাহাবীদের কথা বলব না? তারা প্রত্যেকে দুর্বল বলে বিবেচিত, কিন্তু তারা যদি আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে কোন কথা বলে তবে তা অবশ্যই পূরণ করে। আর আমি কি আপনাকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে বলব না? তারা সবাই কঠোর মনের, অহংকারী এবং আত্মঅহমিকা সম্পন্ন ব্যক্তি।” (বুখারী)

 

৮. সাধ্যমতো নিজের শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী যে যার অবস্থান থেকে বৃহত্তর স্বার্থে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখাঃ

মৌমাছিরা তাদের সুসজ্জিত মৌচাকগুলিতে একসাথে থাকে এবং প্রতিটি মৌমাছি তার সম্প্রদায়ের পক্ষে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করে। রানী মৌমাছি ডিম দেয়; কর্মী মৌমাছিরা ফুল থেকে নেকটার ও পরাগ আহরন করে আনে, মধু তৈরি করে মধু কোষে জমা করে, মৌচাক পরিষ্কার করে, চাকের তাপমাত্রা শীতল রাখে; নার্স মৌমাছি বাচ্চাদের যত্ন নেয়; প্রহরী মৌমাছিরা চাকে অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে চাককে রক্ষা করে।

তেমনিভাবে, মুমিনদেরও তাদের সম্প্রদায়ের প্রতি যে কোনও উপায়ে অবদান রাখতে হবে। সকলেরই নিজেদের ধর্ম, সম্প্রদায় এবং লোকদের প্রতি একটি দায়িত্ব আছে। আমরা যে যেভাবেই থাকি না কেন, আমাদের যে যার বিশেষ বিশেষ দক্ষতা, জ্ঞান ও শক্তি সামর্থ্য দিয়ে আমাদের ধর্ম, সম্প্রদায় এবং মানুষদের কল্যানে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া উচিত।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা. বলেছেনঃ

“তোমাদের প্রত্যেকে রাখাল এবং প্রত্যেকে তার পালের জন্য দায়ী। জনগণের নেতা একজন অভিভাবক এবং সে তার প্রজাদের জন্য দায়বদ্ধ। একজন মানুষ তার পরিবারের অভিভাবক এবং সে তাদের জন্য দায়বদ্ধ। একজন মহিলা তার স্বামীর বাড়ির এবং তার সন্তানদের অভিভাবক এবং সে তাদের জন্য দায়বদ্ধ। একজন লোকের চাকর তার মালিকের সম্পত্তির একজন অভিভাবক এবং এর জন্য সে দায়বদ্ধ। নিশ্চয়ই তোমরা প্রত্যেকে রাখাল এবং তার পালের জন্য দায়বদ্ধ” (সহিহ বুখারী)

 

৯. টিম ওয়ার্কঃ

মৌমাছিরা এই সত্যটির স্বীকৃতি দেয় যে যখন আমি অন্য কাউকে উপকৃত করি তার মানে হল আমরা সকলেই উপকৃত হচ্ছি। একটি মৌমাছি নিজেই একটি মৌচাক তৈরি করতে পারে না। এতে দলের সমস্ত মৌমাছিদের অবদান রাখতে হয় এবং কাজ করতে হয়। কিন্তু আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাস যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন আমরা আমাদের সাফল্য ভাগ করে নেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি ভুলে যাই। কেউ যখন ভাল কাজ করে তখন আমরা তাকে হিংসা করি। তাই, যদি কেউ আমরা একা একা ভাল করতে পারি তবে আমরা এই সাফল্যের কারণগুলি অন্যদেরকে বলতে চাই না কেননা তারাও এটা অনুকরন করতে পারে এবং সফল হতে পারে। এই ধরনের মনোভাবের কারনে জাতি হিসেবে আমরা সামগ্রিক উন্নয়ন থেকে স্পষ্টভাবে বঞ্চিত হচ্ছি।

একটি মৌমাছি নিজে একা বাঁচতে পারে না বা একা একাই মধু তৈরি করতে পারে না, এটিকে তার সহযোগী মৌমাছিদের সাথে সহযোগিতা করতে হয়। সত্যিকারের মুমিনগণও একই রকম।

মৌমাছিরা তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের খুব ভালভাবে যত্ন নেয় এবং অন্যের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি উৎপাদনশীল সমাজ তৈরি করার জন্য কাজ করে, যেখানে প্রতিটি মৌমাছিই যে যার ক্ষেত্রে সমান মূল্যবান এবং সমান গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক সহযোগিতাই হ’ল তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি: একক জীব হিসাবে তারা হাজার হাজার জীবের সমান ক্ষমতার ফলাফল উপভোগ করে। শুধুমাত্র টিমওয়ার্কের মাধ্যমে মৌমাছিরা এই অসাধারণ জিনিসটি অর্জন করে।

সুরা আল-হুজুরাত ১০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ

“মুমিনগণ কেবলমাত্র একক ভাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত।”

আল্লাহ আরোও বলেনঃ

“মুমিন, পুরুষ ও মহিলা একে অপরকে রক্ষাকারী: তারা ভারো কাজের চর্চা করে এবং কুফরী করতে নিষেধ করে। তারা নিয়মিত নামাজ পড়ে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতি আল্লাহ তাঁর করুণা বর্ষণ করবেন, কারণ আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (৯:৭১)

১০. অন্যের ব্যার্থতার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়া, সার্বিক সফলতার জন্য দলের অন্যকে ব্যার্থ হতে না দেয়াঃ

মৌমাছিরা বড় দলের অংশ হিসেবে একসাথে কাজ করে। যদি কোনও একটি মৌমাছি বা দলের কোনও অংশ ব্যর্থ হয়, তবে দলের অন্যান্য সদস্যরা এই ব্যর্থতাকে মেকআপ করার জন্য বিনা বাক্যব্যায়ে এগিয়ে চলে আসে। এ কারণেই তাতের উৎপাদনশীলতা কখনও ক্ষতিগ্রস্থ হয় না।

মুসলমান হিসাবে, আমাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের যাদের সাহায্য প্রয়োজন, যারা শারীরিক বা আর্থিকভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হন না তাদের সহায়তা করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“যে কেউ কোন মুমিনকে দুনিয়া সংক্রান্ত কিছু দুঃখ থেকে মুক্তি দেয়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তাকে তার আখেরাতের কিছু দুঃখ থেকে মুক্তি দববেন। যে ব্যক্তি ঋৃণ পরিশোধ করতে পারছে না এমন অভাবী ব্যক্তির অসুবিধা দূর করে, আল্লাহ তাআলা তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই এই সমস্যা দূর করে দেবেন। যে দুনিয়াতে মুসলমানের দোষ গোপন রাখে আল্লাহ তায়ালা তার দোষ দুনিয়া ও আখেরাতে গোপন রাখবেন। আল্লাহ বান্দাকে ততক্ষণ সাহায্য করবেন যতক্ষণ সে তার ভাইকে সাহায্য করতে থাকবে। যে কেউ এর মধ্যে যদি জ্ঞান অন্বেষণের পথ অনুসরণ করে, আল্লাহ তার পক্ষে জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন।” (মুসলিম)

“মুসলমানের প্রতি আরেক মুসলমান প্রাচীরের ইটের মতো, একে অপরের সাথে লেগে থেকে প্রাচীরকে শক্তিশালী করে তোলে।” [এই কথাটি বলার সময় নবীজী তাঁর হাত দুটি আঙুল দিয়ে ফাঁক করে ধরেছিলেন]

 

১১. ভদ্রতা এবং নম্রতার অনুশীলনঃ

আল্লাহ মৌমাছির দৃষ্টিভঙ্গিকে তার কাজ সম্পাদনে বিনীত ও নম্রতার পরিচয় দেয় বলে উল্লেখ করেছেন। সাফল্য পেয়ে মৌমাছিরা নিজেদেরকে বিশেষ কিছু বিবেচনা করা শুরু করে না এবং গোষ্ঠীর একজন নম্র ভদ্র সদস্য হিসাবে যতটা সম্ভব নিজের পক্ষ থেকে সবচাইতে সেরা টি দেবার প্রচেস্টা চালিয়ে যায়। এটি কিছু করতে পারলে তা নিয়ে অহঙ্কারী হয়ে ওঠে না।

সত্যিকারের মুমিনরাও সর্বদা নম্র এবং বিনীত থাকে এবং শ্রদ্ধা ও সম্মান সহযোগে সবার সাথে আচরণ করে।

সুরা সূরা আল ফুরকানের ৬৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ

“পরম করুণাময়ের বান্দারা হ’ল তারা যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলে এবং যখন অজ্ঞেরা তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা শান্তির কথা বলে।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

আল-কিবর (গর্বিত এবং অহংকার) হ’ল সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং লোকদের দিকে অহমিকার দৃষ্টিতে দৃষ্টিপাত করা।” [মুসলিম, আত-তিরমিযী ও আবু দাউদ] ”

 

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক ধাপ বিনীত, আল্লাহ নিজের কাছে তার সম্মানও এক ধাপ উন্নীত করেন, যতক্ষণ না সে সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছায় এবং যে আল্লাহর প্রতি এক ধাপ অহংকারী, আল্লাহ নিজের কাছে তার সম্মান এক ধাপ কমিয়ে দেন যতক্ষণ না সে সর্বনিম্ন ধাপে পৌঁছে যায়। ” [হাসান হাদীস; আবু সাইদ আল খুদরী কর্তৃক বর্ণিত]

“আল্লাহ আমাকে প্রকাশ করেছেন যে, আমাদের নিজেদের মধ্যে আচরনে নম্র হওয়া উচিত এবং কারও অন্যের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করা উচিত নয়।” [ সহিহ আল-জামি,৬৮৫৬. আয়াদ ইবনে-হামার বর্ণিত]

“যার অন্তরে একটি সরিষার বীজের ওজন পরিমানেরও অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” [সহিহ হাদীস: আল-আলবানী, ২৮৯৪]

 

১২. মৌমাছি কোন কাজকেই ছোট বলে গন্য করে না:

একটি মৌমাছি তার জীবদ্দশায় মাত্র ১/৬ চামচ মধু উৎপাদন করে, তারপরো মৌমাছি তার কাজ ছেড়ে দেয় না। ইমানদার হিসাবে, আমাদের উচিত খুব ছোট একটি কাজকেও (যদি সেটা ভালো কাজ হয়) তুচ্ছ না করা। আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং ভাল কাজ করার জন্য সারা জীবন আন্তরিক চেস্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমরা দুনিয়ায় হয়ত কিছুটা উপকার পেতে পারি তবে আমাদের মূল লক্ষ্যটি আখিরাহ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

“তোমার (মুসলিম) ভাইয়ের সাথে তোমার প্রফুল্ল মুখের সাথে সাক্ষাত হওয়ার মতোও কোন ভাল কাজকে (যতই ছোট মনে হোক না কেন) তুচ্ছ জ্ঞান করবে না ” [মুসলিম]

“নিজের সামর্থ্য অনুসারে সৎকর্ম কর … আল্লাহ পুরষ্কার প্রদান করতে ক্লান্ত হন না যতক্ষণ না তুমি সৎকাজ করতে করতে ক্লান্ত হও … আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজগুলি হলো সেগুলো, যেগুলো ছোট হলেও নিয়মিত করা হয়।” (ফিকহ-উস-সুন্নাহ)

 

১৩. মৌমাছিরা তাদের দলপ্রধান অর্থাৎ তাদের রানীর প্রতি অত্যন্ত অনুগত:

তাতের কাছ থেকে আমরা ন্যায় বিচারক সরকারের প্রতি আনুগত্য শিখতে পারি। মৌমাছিরা রানী মৌমাছির প্রতি অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের চাহিদা পূরণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে।

ধার্মিক শাসক এবং তাদের দলের প্রধানদের প্রতি মুমিনদের সেরকমই আনুগত্য হওয়া উচিত।

মহান আল্লাহ বলেন:

 

“ধিক্ তাদের ক্ষেত্রে যারা জালিয়াতির সাথে লেনদেন করে, যারা পুরুষদের কাছ থেকে পরিমাপ করে গ্রহণ করতে হয়, সঠিক সম্পূর্ণ পরিমাপ। কিন্তু যখন তাদের পরিমাপ বা ওজন দিয়ে পুরুষদের যথাযথভাবে কম দিতে হয় (কোরআন: ৮৩: ১-৭)

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 

“যে প্রতারণা করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়” (মুসলিম, তিরমিজী, আবী দাউদ)

মৌমাছিদের মধ্যে রানী মৌমাছি কেবল শাসনই করে না। বরং এটি সারা জীবন তার অনুগতদের জন্য পরবর্তী প্রজন্ম তৈরিতে একক ভুমিকা রাখে এবং মৌচাকের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। মুসলিম শাসকদেরও এমন চরিত্র হওয়া উচিত এবং উম্মাহর মঙ্গলার্থে জীবন উৎসর্গ করা উচিৎ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“যে ব্যক্তি তার কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না”। (আহমদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজী)

 

১৪. মৌমাছিরা সদা স্বনির্ভর এবং স্বাবলম্বীতা অবলম্বন করে:

মৌমাছিরা সবসময় তাদের নিজস্ব সাধ্যের মধ্যে বসবাস করে। মৌমাছিদের বিশ্বে কোনও ব্যাংক লোন বা ক্রেডিট কার্ড নেই; তাদের সংস্থানগুলি তারা নিজেরাই সংগ্রহ করে এবং সংরক্ষণ করে। তারা প্রতিদিনের খাবারের প্রয়োজন থেকে শুরু করে কোন জরুরী প্রয়োজনের জন্য খাদ্য সংরক্ষণ করে নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তারা তাদের সাধ্যনুযায়ী সবকিছু করে – নিজেদের জন্য এত বেশি নয়, কিন্তু যে মৌমাছিরা এখনও জন্মেনি তাদের জন্যও। এতে মানুষের জন্য একটি স্পষ্ট পাঠ আছে।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেনঃ

 

“আল্লাহ সুদকে সমস্ত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করবেন কিন্তু সদকা করার কাজে বৃদ্ধি দেবেন” ( ২: ২৭৬)

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

 

আল্লাহর রসূল সা. সুদ গ্রহীতা এবং তার প্রদানকারীর উপর এবং যিনি এটি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এদের সাক্ষীদেরকেও অভিশাপ দিয়েছেন, তিনি বলেছেনঃ তারা সকলেই সমান (মুসলিম)।

আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“আমাকে মেরাজের প্রথম রাতেই এমন একদল লোকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো যাদের পেট তাদের বাসস্থানের ঘরের মতো বড়ো ছিল। এবং সেগুলো পূর্ণ ছিল সাপের দ্বারা যেগুলো তাদের পেটের বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমি জিবরাইল আ. কে জিজ্ঞাসা করলাম তারা কে, তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তারা সেই লোক যারা রিবা (সুদ) লেনদেন করত।” (আহমদ, ইবনে মাজাহ)

আবদুল্লাহ ইবনে হানজালাহ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“রিবা (সুদ) দ্বারা একজন লোক জেনে বুঝে করা ৩৩৬ বার একটি ব্যভিচার করার চেয়েও নিকৃষ্ট পাপ।” (আহমদ, দারাকুতনী)

 

১৫. সময় এবং পরিবেশে সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়া এবং সারভাইভ করার সক্ষমতা অর্জন করাঃ

মধু মৌমাছিরা তারা যে পরিবেশে বাস করে তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এবং সে অনুযায়ী তারা লাভ বের করে নিয়ে আসে, নিজেদের সুরক্ষিত রাখে, ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করে। তারা “প্রোপোলিস” ব্যবহার করে মৌচাকের যে কোনও শূন্যস্থান পূরণ করে, যা বাস্তবতা অনুসারে পরিবর্তিত হয় এবং রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে তাদের সুরক্ষা দিতে পারে।

একইভাবে, মুমিনদেরও নিজ ও নিজের পরিবারকে দয়া স্নেহ যত্ন ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে তারা যে সমাজের মধ্যে বাস করছে তার ক্ষতি থেকে নিজেদের রক্ষা করা উচিত। অনৈতিকতা, আসক্তি, সহিংসতা এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক খারাপ প্রভাবের ঝুঁকির বিরুদ্ধে সবচাইতে উপযুক্ত উপায়ে এবং একতাবদ্ধ ভাবে মোকাবেলা করা উচিত।

 

১৬. মৌমাছিরা পারস্পরিক সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে:

মৌমাছিরা দুর্দান্ত যোগাযোগকারী এবং তাদের কলোনির চারপাশে জটিল বার্তা দেওয়ার জন্য কম্পন, ফেরোমোন এবং নাচ ব্যবহার করে। তারা পুরো দলটিকে ক্ষনে ক্ষনে আপডেটকৃত তথ্যের ওপর রাখে; বিপুল পরিমাণে পরাগ পাওয়া যেতে পারে এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ টিপস অন্য সদস্যদের কাছে সাথে সাথেই রিলে করা হয়।

মুমিনদেরও পারস্পরিক যোগাযোগের সময় খোলাখুলি হওয়া উচিত এবং মানবিকতা ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের পক্ষে উপকারী হতে পারে এমন কোন তথ্য গোপন করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। আমাদের সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগ কৌশল এবং স্টাইল ব্যবহার করা উচিত, এবং তা তা নিশ্চিত করার জন্য যে বার্তাটি যেমন পাওয়া গেল, কোন প্রকার গোপনীয়তা বা অতিরন্জন ছাড়া ঠিক তেমনটিই প্রচার করা উচিৎ।

আবদুল্লাহ মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন:

 

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “সত্যবাদিতা ন্যায়পরায়ণতার দিকে পরিচালিত করে এবং ন্যায়পরায়ণতা জান্নাতে নিয়ে যায়।”

একজন ব্যক্তি সদা সত্য কথা বলবেন এবং সদা সত্য কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন যতক্ষণ না তিনি আল্লাহর কাছে সিদ্দিক হিসাবে লিপিবদ্ধ হন (সত্য বক্তা)। মিথ্যা বলা দুষ্টতার দিকে পরিচালিত করে এবং দুষ্টতা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

 

১৭. মৌমাছিরা যে কোন সিদ্ধান্তে মাশোয়ারা (পরামর্শ) করে:

মৌমাছিরা একটি শুরা মেইনটেইন করে, যেখানে সকলে পরামর্শ সভা করে থাকে। সেখানে তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মূল ও অভিজ্ঞ সদস্যদের সিদ্ধান্তকে সম্মান দেয়, যেমনটি একটি নতুন মৌমাছিকেও দেয়।

ইমানদারদের আচরণও এমন হওয়া উচিত। নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সকলের সাথে মিলে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেনঃ

“এবং তারা (মুমিন) তাদের পালনকর্তার ডাকে সাড়া দেয় এবং নামায আদায় করে, এবং তারা পারস্পরিক পরামর্শ নিয়ে তাদের বিষয় পরিচালনা করে এবং কে আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তা ব্যয় করে ” (৪২: ৩৮)

মাশোয়ারার লাভ হলো একটি সঠিক সিদ্ধান্তে আসা যায়, পরস্পর মিলমহব্বত পয়দা হয় , খায়ের ও বরকত লাভ হয়, উত্তম প্রতিদান পাওয়া যায়।

 

১৮. ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে দাড়ানোর ক্ষমতা:

মৌমাছি প্রাচীনকাল থেকেই বিকশিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর বুকে অনেক বড়ো বড়ো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, কিন্তু মৌমাছিরা সদাই ক্রমবর্ধমান, এবং তারা নিষ্টার সাথে তাদের কাজ করে চলেছে।

মরুভুমি, পাহাড় পর্বত, পাহাড়ের গুহা, উঁচু উঁচু গাছ, গাছের কোটর, এমনকি মানুষের আবাস্থলেও তারা দক্ষতা এবং বিশেষ পারদর্শিকতার সাথে মৌচাক প্রতিস্ঠা করে থাকে এবং মধু উৎপাদন করে থাকে।

মুমিনদেরও একই হওয়া উচিত। আমরা যে বিপদ-আপদ মোকাবেলা করি না কেন এবং আমাদের যে বিপদ আসে তার থেকো আমাদের পুনরায় একত্রিত হওয়ার জন্য এবং আমাদের উম্মতের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। যে কোন প্রতিকুল পরিবেশেও টিকে থেকে উৎপাদনমুখী আচরনে পারদর্শী হতে হবে।

 

১৯. অভিজ্ঞতা এবং ইতিহাস থেকে শেখা:

মৌমাছির যতগুলো কাজ এবং শর্তের সংস্পর্শে আসে সবগুলো মনে রাখে। তারা যেসকল ফুলে ভ্রমন করে থাকে তার সবগুলোর ডিটেইলস ডাটা তাদের মেমোরিতে সংরক্ষন করে। প্রতিবছর মৌসুম এলে তারা এসব তথ্য সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে সেরা মধুটাই প্রস্তত করে থাকে। তারা প্রতিনিয়ত পরস্পরকে নিজের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা আদানপ্রদান করে নিজেদের আপডেট রাখে।

বিশ্বাসী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এমন হওয়া উচিত, যাতে একে অপরকে নতুন দক্ষতা শিখতে, শেখাতে এবং বিকাশের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে।

মৌমাছিরা কখনই খাদ্য অনুসন্ধান এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের ক্রিয়াকলাপ পরিচালনার জন্য প্রকৃতি থেকে শেখা বন্ধ করে না এবং সর্বদা প্রাপ্ত সর্বশেষ অভিজ্ঞতাও ব্যবহার করে। তারা ফুল এবং ঘ্রান লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে পরাগ ও নেকটার প্রদান করে এমন ফুলের ধরণগুলি মনে রাখে।

মুমিনদেরও তাদের অভিজ্ঞতা থেকে এবং তাদের ইতিহাস থেকে শিখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা করা উচিত। আমাদের বারবার একই সমস্যার দ্বারা ভোগা উচিৎ না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

 

“ইমানদারকে একই গর্ত থেকে দু’বার কামড়ানো হয় না।”

(বুখারী / মুসলিম)

 

উপসংহার:

যদি কোনও ব্যক্তি দিকনির্দেশনা নিতে আগ্রহী হয়, তার জন্য একটি পোকামাকড়ও যথেষ্ট  জীবনমুখী এবং জীবনগঠনমুলক জ্ঞান প্রদান করতে সক্ষম, যেমন এই মৌমাছি।

আল্লাহ আমাদেরকে তাদের মতো পরিণত করুন, যারা আল্লাহর নিদর্শনের প্রতিফলন করে এবং তাঁর আয়াতসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।

“মুমিনরা কেবল তারাই, যারা আল্লাহর নাম বর্ণিত হলে তাদের অন্তরে ভয় অনুভূত হয় এবং যখন তাঁর আয়াতসমূহ (এই কুরআন) তাদের কাছে তেলাওয়াত করা হয়, তখন তারা (অর্থাৎ আয়াতসমূহ) তাদের ইমানকে বাড়িয়ে তোলে; তারা তাদের পালনকর্তার উপর ভরসা করেছিল; যারা নামাজ আদায় করে এবং আমরা তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই সত্যবাদী, ইমানদার। তাদের জন্য রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট সম্মান এবং ক্ষমা ও জান্নাত।” (সুরা আনফাল: ২-৪)।

মধু সম্পর্কিত আরও কিছু পোস্টঃ

 

১. মধু ও শারীরিক সুস্থতা > টপিক:শারীরিক সুস্থতায় মধু গুণাগুণঃ

পর্ব-০১: https://www.facebook.com/102914111160597/posts/164428901675784/

পর্ব-০২: https://www.facebook.com/102914111160597/posts/167357614716246/

২. মধু ও স্বাস্থ্য > টপিক:সাধারন জ্বর, ঠান্ডা, কাশি প্রতিরোধে মধুর ঔষধি গুণঃ

https://www.facebook.com/102914111160597/posts/153922509393090/

 

 

আশ শেফার মধু- বাংলাদেশের সেরা মধুঃ

 

আশ শেফা আপনার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুধু খাঁটি মধুই সংগ্রহ করে না, মধুর সর্বোচ্চ মানও নিশ্চিত করে। তাই আশ শেফা মধুঘরের মধু নিঃসন্দেহে খাঁটি তো বটেই, পাশাপাশি মানের দিক থেকেও দেশ সেরা। আশ শেফার অনলাইন স্টোরে বিভিন্ন ধরণের মধু রয়েছে।  এখান থেকে বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত হতে নিশ্চিন্তে খাঁটি মধু সংগ্রহ করতে পারেন। খাঁটি স্বাস্থ্যকর মধুর ক্রয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য আশ শেফার মধুর সম্পর্কে আরও যে কোনও বিস্ততারিত তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে আশ শেফা মধুঘরের সাথে 01919442385 নাম্বারে বা অনলাইনে ashshefa.com এ যোগাযোগ করুন।

সবাইকে ধন্যবাদ। সকলের নীরোগ স্বাস্থ্য কামনায় সদা আপনার পাশেই

আশ শেফা মধুঘর

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Call Now Button