আশ শেফা মধুঘর

মৌমাছিরা মধু কিভাবে বানায়?

১০০ গ্রাম মধু তৈরী করার জন্য একটা অনুসন্ধানী মৌমাছি প্রয়োজনে দশ লক্ষ ফুলেও বিচরন করে! এক কিলোগ্রাম মধু তৈরী করার জন্য অনুসন্ধানী মৌমাছিকে এক লক্ষ বিশ হাজার থেকে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বোঝা সুধা বয়ে আনতে হয়। মৌচাক থেকে ফুলের অবস্থান যদি ১৫০০ মিটার দুরে হয় তবে প্রত্যেকটি বোঝার জন্য তাদের উড়তে হয় তিন কিলোমিটার। এভাবে এক কিলোগ্রাম মধুর জন্য তাদের সর্বমোট উড়তে হয় তিন লক্ষ ষাট হাজার থেকে চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার কিলো দূরত্ব। যা পৃথিবীর পরিধির আট থেকে এগারো গুন।

শুড় দিয়ে ফুলের সুধা চুষে নিয়ে মৌমাছি মধু পাকস্থলী ( যদিও সত্যিকারভাবে তা পাকস্থলী নয়) পূর্ন করার পর মৌচাকে ফিরে আসে। ফিরে আসার পর মৌচাকে অবস্থানরত অনান্য কর্মী মৌমাছিরা অনুসন্ধানী মৌমাছিদের অভ্যার্থনা জানায়। গৃহী মৌমাছিরা তাদের বোঝামুক্ত করে তা কিছুক্ষণ নিজেদের মধু পাকস্থলীতে রেখে দেয়।

সেখানে সুধাতে এক জটিল প্রকৃয়া চলে যার শুরু অনুসন্ধানী মৌমাছির পাকস্থলীতে। গৃহী মৌমাছি সুধার প্রকৃয়ার কাজ যেভাবে চালায় তা নিম্নরূপঃ

মৌমাছি তার মুখের অংশ অর্থ্যাৎ নিচের চোয়াল পাশের দিতে খুলে শুড়দুটো সামনে পিছনে একটুখানি প্রসারিত করে। এর ফলে এক বিন্দু সুধা শুঁড়ের মাথায় এসে জমা হয়। এবং মৌমাছি শুঁড় ভেতরে নিয়ে তা আবার নিজের মধু পাকস্থলীতে রাখে।

 

এভাবে সুধা উগড়ে দেওয়া ও গিলে ফেলার কাজ চলে ১২০ থেকে ২৪০ বার। তারপর কোনো খালি খোপ খুঁজে নিয়ে গৃহী মৌমাছি তার সুধাটুকু জমা করে রাখে। তখনও কিন্ত তা মধুতে পরিনত হয় না। অন্যান্য কর্মী মৌমাছি এরপর সুধাকে মধুতে পরিনত করার জটিল কাজটি চালিয়ে যায়। গৃহী মৌমাছিরা খুব কর্মব্যাস্ত থাকলে অনুসন্ধানীরা নিজেরাই তাদের সুধাবিন্দুর বোঝাটুকু মধু খোপের উপরের প্রাচীরে লাগিয়ে রাখে। এভাবে রাখা ঝুলন্ত বিন্দগুলো তলায়তন বেশি পায়। ফলে জলীয়ভাগের বাষ্পীভবনেও সুবিধা হয় বেশি।

সুধায় জলীয় অংশের পরিমান শতকরা ৪০ থেকে ৮০ ভাগ থাকে এবং তাকে মধুতে পরিনত করতে হলে কখনও কখনও তার তিন চতুর্থাংশ জলীয় অংশ দুর করতে হয়। পাকা মধুতে জলীয় অংশের পরিমান দাড়ায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। প্রত্যেকটি সুধাবিন্দু এক খোপ থেকে অন্য খোপে বারবার করে বয়ে নিয়ে কর্মী মৌমাছিরা একটানা বাষ্পীভবন চালিয়ে যাওয়ার কাজে সাহায্য করে। কাঁচা সবুজ মধু ঘন মধুতে পরিনত না হওয়া পর্যন্ত এরকম চলে।

সুধা থেকে জলীয় অংশ দূর করার এ কাজটি অনেক মৌমাছি অন্যভাবেও করে। তার পাখা দিয়ে বাতাস করে( মিনিটে প্রায় সাতাশ হাজার বার) মৌচাকে অতিরিক্ত বায়ু সঞ্চালনের ব্যাবস্থা করে। এভাবে বিশুদ্ধ যান্ত্রিক প্রকৃয়ায় শুধু সুধা ঘনীভূত হয় না মৌমাছির মধু পাকস্থলীতে থাকা অবস্থায়ও তার ঘনীভবনের কাজ চলে।

মৌমাছির মধু পাকস্থলীর কোষগুলোর মাধ্যমে সুধা থেকে জলীয় অংশ পরিশোধিত হয়ে তা তাদের রক্তের লসিকা রসের সাথে মিশে যায়। তারপর বৃক্ক হিসেবে কার্যরত মেলপিজি নালিকায় গিয়ে তা দেহ থেকে নিঃসৃত হয়। মৌমাছির দেহের ভিতরেই এভাবে সুধাবিন্দু আয়তনে কমে যায়। উপরন্ত সেখানে তা উৎসেচত( এনজাইম) জৈব অম্ল, জীবাণুনাশক এবং অনান্য পদার্থে সমৃদ্ধ হয়। মধু পাকস্থলী থেকে সুধাবিন্দু খোপে স্থানান্তরিত করা হলেও মধুতে পরিনত না হওয়া পর্যন্ত এই প্রকৃয়ার অব্যাহত পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে।

মধুকোষের খোপগুলো মধুতে পরিপূর্ণ হয়ে গেলে মৌমাছি মোম দিয়ে সেগুলোর মুখ বন্ধ করে দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আশ শেফা মধুঘর

FREE
VIEW