আশ শেফা মধুঘর

মানুষ না মৌমাছি, পৃথিবীর জীবকুলের টিকে থাকার জন্য কে বেশী গুরুত্বপূর্ণ?

 

মানুষ না মৌমাছি, পৃথিবীর জীবকুলের টিকে থাকার জন্য কে বেশী গুরুত্বপূর্ণ?

 

পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মানুষ নয় বরং ছোট্ট প্রাণী মৌমাছিরই টিকে থাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিস্তু কেন?

পৃথিবীর জীবজগতে মানুষ সবচেয়ে নবীন, বুদ্ধিমান এবং টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর(vulnerable) প্রাণী। পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের ইতিহাস মাত্র কয়েক লক্ষ বছরের, অথচ অন্যান্য প্রাণীরা কোটি বছর এমনকি শত কোটি বছর ধ’রে টিকে আছে। যে প্রাণী যত বছর ধ’রে টিকে আছে, বসবাসে জন্য তাকে সবচেয়ে উপযোগি হিসেবে ধরে নেয়া হয়। কারণ, কোটি কোটি বছর ধ’রে তারা বিভিন্ন প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই টিকে আছে। এক্ষেত্রে কোটি কিংবা শত কোটি বছররের অভিযোজনের অভিজ্ঞতার কাছে কয়েক লক্ষ বছরের অভিজ্ঞতা একেবারেই নস্যি।

আর পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যাদের রান্না করে খেতে হয়, পোশাক পরতে হয় ইত্যাদি। অন্যান্য প্রাণীদের সাথে অভিযোজনের আভিজ্ঞতার পার্থক্য, বেঁচে থাকতে অন্যান্যা প্রাণীদের চেয়ে অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দমূলক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদির কারণে পৃথিবীতে বসবাসের জন্য মানুষকে সবচেয়ে বেশী স্পর্শকাতর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এদিকে মানুষের অহেতুক অধিক চাহিদা এবং ভোগবিলাসিতার যোগান দিতে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ফলে জলজ-স্থলজ প্রতিবেশের বিভিন্ন প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিমি, ডলফিন, মৌমাছি এসব প্রাণী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

 

পৃথিবীর স্থলজ জীবকুলের টিকে থাকার জন্য মৌমাছিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। কারণ, পৃথিবীর প্রাণীকুল যেসব উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল তাদের প্রায় শতকরা আশি ভাগের বংশবৃদ্ধি তথা পরাগায়ন ঘটে মৌমাছির দ্বারা। পৃথিবী থেকে মৌমাছির বিলুপ্তি ঘটলে পৃথিবীর সকল স্থলজ প্রাণী এবং আশি শতাংশ উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঘটবে।

 

সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে যে, মানবসৃষ্ট কারণে জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষিকাজে বাছবিচারহীন কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পৃথিবীব্যপি মৌমাছির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং পাচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যাকে পৃথিবীর জীবজগতের গণবিলুপ্তির(mass extinction) প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ, পৃথিবীতে মৌমাছির সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেলে কিংবা পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে মৌমাছির বিলুপ্তি ঘটলে, পৃথিবীর স্থলজ জীবকুলের গণবিলুপ্তি ঘটবে।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে ভোগবিলাসি এবং টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রাণী মানুষের চুড়ান্ত অবলুপ্তি ঘটলে পৃথিবীর জলজ-স্থলজ বাস্তুসংস্থান তথা পরিবেশ-প্রতিবেশ সুনিপূনভাবে সুবিন্যাস্ত হবে। পৃথিবীটা সবুজ বৃক্ষ, রঙিন ফুল, স্বচ্ছ-পরিষ্কার পানি আর নির্মল বাতাসে ভরে উঠবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এমনটা ঘটলে মানবসমাজের কোনো প্রতিনিধিরই সেই স্বর্গীয় পরিবেশে জীবনধারণের সুযোগ হবেনা। অর্থাৎ, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে শুধুমাত্র মানবজাতির বিলুপ্তিই পৃথিবীর অবশিষ্ট জীবজগতকে একটি স্বর্গীয় পৃথিবী উপহার দিতে পারে।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, পৃথিবী থেকে মৌমাছি নামক একটা ছোট্ট প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটলে পৃথিবীর স্থলভুমি বিরানভুমি হবে। অপরদিকে মানুষ নামক প্রাণীর অবলুপ্তি মানেই অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদের জন্য পৃথিবীটা স্বর্গ হয়ে ওঠা।

সুতরাং পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মানুষ নয় বরং ছোট্ট প্রাণী মৌমাছিরই টিকে থাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু পৃথিবীর জীবজগতের আর কোনো প্রজাতির অবলুপ্তি আমরা চাইনা। পৃথিবীর ছোট-বড় সকল উদ্ভিদ-প্রাণীই টিকে থাক। সেজন্যে বর্তমান প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা চাই জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন এবং কীটনাশকবিহীন কৃষিপন্য উৎপাদন। এটা করতে পারলেই কেবল বর্তমান সভ্যতার অগ্রযাত্রা সঠিকভাবে চালিত হবে। তা না হলে একদিন পৃথিবী থেকে শুধু মানুষেরই অবলুপ্তি ঘটবে না, পৃথিবীর স্থলজ জীবজগতের গণবিলুপ্তির সাথে জলজ জীবজগতেরও একাংশের অবলুপ্তি ঘটবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আশ শেফা মধুঘর

FREE
VIEW